মাছ খাওয়ার পর প্লেট থেকে পড়ে যাওয়া একটা কাঁটা। মেঝেতে পড়েছিল, ঘরের কেউ খেয়াল করেনি..See more
মাছ খাওয়ার পর প্লেট থেকে পড়ে যাওয়া একটা কাঁটা। মেঝেতে পড়েছিল, ঘরের কেউ খেয়াল করেনি।
একজন মহিলা, বয়স ৪৫, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের রোগী। সুগার নিয়মিত মাপতেন না, ওষুধও মাঝেমধ্যে বাদ দিতেন। অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও দেখতেন, কীভাবে ওষুধ ছাড়া শুধু অর্গানিক খাবার খেয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভাবতেন, "একটু এদিক-সেদিক হলে সমস্যা নাই।" রাতে ঘরের মধ্যে খালি পায়ে হাঁটার সময় পায়ের তলায় একটা মাছের কাঁটা বিধে গেল। ব্যথা লাগলো, কিন্তু খুব বেশি না। স্বাভাবিকের চেয়ে কমই মনে হলো তার কাছে।
কাঁটাটা তুলে ফেললেন, সামান্য পানি দিয়ে পা ধুয়ে নিলেন। ডাক্তার দেখানোর কথা মাথাতেই এলো না - "সামান্য কাঁটার খোঁচা, এমনিতেই সেরে যাবে" ভেবে নিজের কাজে ফিরে গেলেন।
তিনদিন পর পায়ের তলায় ফোলাভাব দেখা দিল, হালকা দুর্গন্ধও আসছিল। তাও তেমন গায়ে লাগালেন না। "সেরে যাবে" এই ভরসাতেই আরও কয়েকদিন কাটিয়ে দিলেন।
এক সপ্তাহ পর পুরো পাটাই ফুলে গেল, রঙ পাল্টে কালচে হয়ে আসতে লাগলো, প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতে লাগলো ক্ষত থেকে। এবার পরিবার জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ডাক্তার দেখেই বুঝলেন, ইনফেকশন এতদিনে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, টিস্যু মরে যেতে শুরু করেছে (গ্যাংগ্রিন)। রক্ত পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ছিল প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে।
কয়েকদিন এন্টিবায়োটিক আর ড্রেসিং করেও ক্ষত ভালো হওয়ার লক্ষণ দেখা গেল না। ইনফেকশন শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলো। ডাক্তাররা পরিবারকে ডেকে ভয়ংকর একটা কথা বললেন, "পা-টা না কাটলে ইনফেকশন পুরো শরীরে ছড়িয়ে জীবনটাই ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।"
একটা সামান্য মাছের কাঁটা থেকে শুরু হওয়া ঘটনার শেষ হলো হাঁটুর নিচ থেকে পা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে।
ওই মহিলা বেঁচে গেলেন ঠিকই, কিন্তু বাকি জীবনটা কাটাতে হবে একটা পা ছাড়াই।
এত বড় একটা ঘটনা কীভাবে ঘটলো শুধু একটা মাছের কাঁটা থেকে? পুরো গল্পে আসলে কয়েকটা ক্লু ছিল, একসাথে মিলিয়ে দেখলেই আসল কারণটা বোঝা যায়।
প্রথম ক্লু: ব্যথাটা "স্বাভাবিকের চেয়ে কম" মনে হয়েছিল। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে পায়ের নার্ভ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে neuropathy। ফলে পায়ে অনুভূতি কমে যায়, ব্যথা ঠিকমতো টের পাওয়া যায় না। আর আমরা কেবল তখনই ডাক্তারের কাছে যাই যখন ব্যাথা অসহ্য হয়ে যায়। যেহেতু ওই মহিলা ব্যাথা টের ই পাচ্ছিলেন না তাই কাঁটার খোঁচাটাকে গুরুত্ব দেননি।
দ্বিতীয় ক্লু: ছোট্ট একটা ক্ষত সারলো না, বরং দিন দিন খারাপ হতে লাগলো। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে রক্তনালী সরু হয়ে যায়, পায়ে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। রক্ত কম পৌঁছালে ক্ষত সারার প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ে।
তৃতীয় ক্লু: ইনফেকশন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো। রক্তে সুগার বেশি থাকলে শরীরের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতাও কমে যায়।
কম অনুভূতি, কম রক্ত সরবরাহ, আর কম প্রতিরোধ ক্ষমতা এই তিনটে মিলেই একটা ছোট ক্ষতকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল এই মহিলার ক্ষেত্রে। আর ওষুধ ছাড়া শুধু "অর্গানিক" খাবারে সুগার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাটা এই ঝুঁকিটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল - কারণ সুগার আসলে নিয়ন্ত্রণেই ছিল না।
এই গল্পটা সবার সাথে ঘটে না। যাদের ডায়াবেটিস নেই, বা যাদের সুগার নিয়ন্ত্রণে আছে, তাদের একটা কাঁটার খোঁচায় এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু ডায়াবেটিস, বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে এই ঝুঁকিটা বাস্তব, আর যার সাথে ঘটে তার জন্য এটা জীবন বদলে দেওয়া একটা ঘটনা।
তাই কিছু কথা মনে রাখা জরুরি -
- ডায়াবেটিস থাকলে ঘরের মধ্যেও খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলুন, কারণ পায়ে অনুভূতি কমে থাকতে পারে, টেরই পাবেন না।
- প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে পা ভালো করে দেখুন - কোনো ক্ষত, ফোসকা, বা কাঁটা নেই তো? এটাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলুন।
- যেকোনো ক্ষত, যত ছোটই হোক, সাথে সাথে পরিষ্কার করুন আর প্রয়োজনে ডাক্তার দেখান - "সেরে যাবে" ভেবে ফেলে রাখবেন না।
- সুগার নিয়মিত মাপুন, ওষুধ নিয়মিত খান - শুধু "অর্গানিক" খাবারের ভরসায় ওষুধ বন্ধ করবেন না, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা পরিবর্তন করবেন না।
মাছ বা মাংস খাওয়ার পর হাড়-কাঁটা অসাবধানতাবসত মেঝেতে যেন না পড়ে খেয়াল রাখুন, এবং ঘর ঝাড়ু দিন। এটুকু সাবধানতাও অনেক কিছু এড়াতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সুস্থ রাখুন, আর ছোট ছোট সতর্কতাগুলো মেনে চলার তৌফিক দিন। কারণ অবহেলা করা ছোট জিনিসটাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
~শাহরিয়ার, MBBS Final Year
🎁 Your Special Offer is Loading...
Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.
⏳ Stay here — your offer will open shortly.
✅ You can go back to this page anytime.

Comments
Post a Comment